আপনারা বেডরুমে ঢুকছেন কেন, মানুষেরওতো প্রাইভেসি আছে

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু একটি পরিচিত মুখ। তিনি রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী। বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যও তিনি।

ব্যবসায়ী হিসেবে শতভাগ সফল এই মানুষটি রাজনীতিতেও অনেক অবদান রাখছেন। ছিলেন মন্ত্রী। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে সিরাজগঞ্জ-২ আসন থেকে

দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০১ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রথমবার জেলে যান জরুরি জমানায়। জেনারেল মঈন ইউ আহমেদের দুই বছরের শাসনকালে ২২ মাস কারারুদ্ধ ছিলেন।

অতিসম্প্রতি ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ‘আব্বু ওরা এসে গেছে’ বইটি প্রকাশ হয়েছে। গত ২৭শে জুন বইটির প্রকাশনা উৎসব হওয়ার কথা ছিল। অনিবার্য কারণে সেটা স্থগিত করা হয়। বইতে লিখেছেন, ৩রা ফেব্রয়ারি, ২০০৭ সাল।

দিবাগত রাত ১২টার পর (৪ঠা ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহর)। ভাত খেয়ে টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠান দেখছিলাম। এমন সময় আমার ছেলে আবেদ হাসান মাহমুদ এসে বললো, ‘আব্বু ওরা এসে গেছে।’ আমি বললাম, ‘আসতে দাও, ভয় পেও না। তোমার দাদা বৃটিশদের ভয়

করেননি, আমি পাকিস্তানিদের ভয় করিনি, তুমি ভয় পেয়ো না। গেট খুলে দাও তাড়াতাড়ি।’ কিন্তু ততক্ষণে ওরা আমার বাড়ির দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে মারধর শুরু করেছে। আমার বাড়ির বাবুর্চি মন্টুকে এমন পিটুনি দিয়েছে, তার দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

বিদেশি একটি জাহাজে বাবুর্চির কাজ করতো মন্টু। আমি আমার বাড়িতে নিয়ে এনেছিলাম তাকে। আমাকে গ্রেপ্তারের তিন চার বছর পর অসুস্থ অবস্থায় মারা যায় মন্টু। আমাদের আসাদ গেটের বাড়ির অফিস সহকারী শরিফুল ইসলামের গায়েও হাত তুলেছিল তারা। ওর ভাষ্য, বাবুর্চি মন্টুকে ওরা বন্দুকের নল দিয়ে পিটিয়েছিল।

বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীদেরকেও মারধর করেছিল আমাকে আটক করতে আসা অফিসাররা। সবচেয়ে অসম্মানজনক ছিল- যে অফিসার বাড়িতে এসেছিল, তাকে সুস্থ মনে হয়নি। কাজটি সে উৎসাহ নিয়ে করতে এসেছে সেটাও মনে হয়নি। মনে হয়েছে আদেশ পালন করছে। আমার বাড়ির বেডরুমে ঢুকে পড়ে ওই অফিসার।

এ অবস্থায় আমার স্ত্রী রুমানা মাহমুদ বারবার বলার চেষ্টা করছেন- “আপনারা আসছেন, বসুন, আমি হাজবেন্ডকে ডেকেছি, তিনি রেডি হয়ে আসবেন আপনাদের কাছে। আপনারা বেডরুমে ঢুকছেন কেন? মানুষেরতো প্রাইভেসি আছে।” ওই আর্মির অফিসার- মেজর নাকি কর্নেল আমি জানি না।

সে বলছিল- “ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট”। আমার স্ত্রী রুমানা মাহমুদ জবাব দিচ্ছিলেন যে- “হোয়াই ইউ আর আস্ক মি টু ক্রস মাই লিমিট? ইউ হ্যাভ ক্রস ইউর লিমিট। ইউ হ্যাভ নো রাইট টু কাম মাই বেডরুম।” যাইহোক, ওরা আমার বেডরুমের সবকিছু তছনছ করে দিলো, কী আছে না আছে, এসব জানতে চাইলো। আমি সাধারণত বাড়িতে কিছু টাকা পয়সা রাখতাম,

কখনো যদি অসুস্থ হলে প্রয়োজন পড়ে। এ কারণে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সব সময় বাড়িতে থাকতো। বহু বছর ধরে আমি এটা করি। যখন থেকে আমার হাই প্রেসার আর হৃদরোগ ধরা পড়ে, তখন থেকে। ওই টাকাটাও দিয়ে দিলাম। এছাড়া আর কিছু পায়নি ওরা, নিতেও পারেনি। পরে আমি মামলা করে ওই অর্থটা বের করে এনেছিলাম।আমি সারাজীবন সাদাসিধে জীবনযাপন করছি। আমার ঢাকা শহরে কোনো বাড়িঘর ছিল না। আমি বাপের বাড়িতে থাকি।

কোনো জমিজমা ছিল না। শেষ দিকে এসে সবাই বললো, ছেলে-মেয়ে আছে। কিছু একটা অন্তত তাদের জন্য হলেও রেখে যেতে। আমার বাবা একটি সরকারি প্লট নেয়ায় আমি সরকারি প্লট নেইনি। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আমি ও আমার পার্টনার প্লটের আবেদন করেছিলাম এবং দুজনের পরিচালনাধীন কোম্পানি থেকে একাধিক কিস্তিও জমা দিয়েছিলাম।

যাই হোক, সেদিন আমাকে খুব বাজে এবং ভয়ঙ্কর প্রক্রিয়ায় ধরে নিয়ে গেল। ওই সময় উপস্থিত অফিসার আমার সন্তানদের বললো- “বসে থাকেন, কথা বলবেন না।” আমাকে যখন হাতমুড়ি দিয়ে একজন সৈনিককে হ্যান্ডকাফ পড়ানোর আদেশ দেয়, ওই সৈনিকটি ইতস্ততবোধ করছিল। সে আমার একহাতে হ্যান্ডকাফ লাগানোর পর, ওই অফিসার ধমকের সুরে বললো, “এক হাতে কেনো? দুই হাতে পরাও পেছন মুড়ি দিয়ে!” মনে হচ্ছিল, তারা প্রত্যেকেই সামরিক বাহিনীর, কিন্তু ওই সৈনিকটি বিব্রতবোধ করে, আমার দুই হাতেই হ্যান্ডকাফ পরায়।

এটা ভাবা যায়- আমি একজন রাজনীতিক; প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যবসায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে শিল্পপতি। ওই রাতে অন্তত ঘণ্টা দুয়েক ওই লোকেরা আমার বাসায় অবস্থান করেছে। আমাকে যখন হ্যান্ডকাফ পরায় আমার ছেলের বউ চিৎকার করে উঠলো- “হোয়াট আর ইউ ডুয়িং? বাবাতো ব্যথা পাবে।” নতুন বিয়ে হয়েছে তখন আমার ছেলের। বউমার চিৎকারেও কাজ হয়নি। আমার হাতমুড়ি দিয়ে বাসার নিচে নামানোর পর গাড়িতে ওঠানোর আগে চোখ বেঁধে দিলো গামছা দিয়ে। গাড়ি মোছার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল গামছাটি। চোখ বেঁধে আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে নিলো। আমিতো জানতাম না কারা নিয়ে যাচ্ছিল। অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট নাই, কারা তাও বলেনি। খালি বলে- “আমাদের পরিচয় লাগে না।”

আমার স্ত্রীকে বলে গেলাম, ‘যদি আমার লাশ পাও তাহলে আমাকে আমার বাবা মায়ের পায়ের কাছে দাফন দিও। সিরাজগঞ্জে কবর দিও। আর লাশ না পেলে কী করবা, কিছুতো করার নাই।’ প্রায় আধাঘণ্টা গাড়ি চললো। চোখ বাঁধা থাকায় কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি- এসব কিছুই জানি না। পথটা দীর্ঘ লাগছিল। আর এদিকে আমার চিন্তায় নানা উৎকণ্ঠা কাজ করছিল, কী করবে আমার সঙ্গে। কী পরিণতি হবে? শারীরিক নির্যাতন করবে? আমাকে মারবে? এ রকম নানা দুশ্চিন্তা ভর করছিল এসে। প্রায় আধা ঘণ্টা পর গাড়ি থামে, গাড়ি থেকে নামানোর পর চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হয়। দেখি, আলোয় ঝলমলে পরিবেশ, বিডিআর ক্যাম্পে (বর্তমান বিজিবি হেডকোয়ার্টার্স)। ক্যাম্পে সৈনিকদের থাকার জন্য যে ব্যারাক, সেখানে আমাকে নেয়া হয়েছে। তারপর খাতাপত্রে কী কী জানি লিখলো অন্য অফিসাররা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.