মামাতো বোনের বয়স তেরো কিংবা চৌদ্দ, তখনই…

গল্প:মামাতো বোনের বয়স তখন তেরো কিংবা চৌদ্দ, ছুকড়ির মুখ দিয়ে তখন দুধের গন্ধ বের হয়। তখনই আব্বা সেই মেয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করলেন,

বিয়ের তারিখ ছিল তেরোই শ্রাবণ। মামার অঢেল মেঠো খেত আর সিন্দুক ভরা টাকা পয়সার প্রতি আব্বার লোভটা ছিল আমার বিয়ে করার তাড়ার চেয়েও প্রবল।

কন্যাদায়ের চিন্তায় পিতার নির্ঘুম রাত কাটে, দুশ্চিন্তায় দিনগুলো কচ্ছপের মতো হাঁটে। তবে পুত্রদায়েও যে পিতার অবস্থা একইরকম হয় তা আব্বাকে না দেখলে জানতেই পারতাম না।

দুর্দান্ত স্মার্ট মেয়ে, গ্ল্যামার দিয়ে ছেলেদের যে মেয়েগুলা নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাত ওরাই ছিল আমার ব্যাচমেট। যে পাঁচটা বছর ঘর ছেড়ে পড়াশুনার খাতিরে বাইরে ছিলাম

সে পাঁচটা বছরে আমার বিদ্যা কতটুকু দৌড়েছে কিংবা কী শিখেছি সেটা না জানলেও এটা ঠিকই জানতাম বিয়ে করলে এমন কাউকেই করব যার সাথে তর্কে হেরে যাব, দাবা খেলতে বসে গো হারা হারব কিংবা এমন কাউকে যে রক্ত-মাংসের ঐ শরীরটাকে পুঁজি করে কেবল আমায় আটকে রাখবে না।

আব্বা আমার স্বপ্ন কিংবা ইচ্ছের মুখে বাসি ছাই ঢেলে দিয়ে বারো তারিখ ভরদুপুরে আমার গায়ে হলুদের ব্যবস্থা করলেন, মা-চাচিরা নেচে-গেয়ে গায়ে হলুদ দিল, ক্ষীর রেঁধে তা গ্রামের সবাইকে খাওয়ানো হলো। বারো তারিখ রাত্তিরে আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, কেন আমি আব্বার লোভকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজেকে বিক্রি করে দিচ্ছি? ভেতর থেকে কেউ একজন উত্তরে বলেছিল, ” সজল, তুই পুতুল হয়ে গেছিস, মানুষ হয়ে বাঁচ, পাখির মতো বাঁচ, পালা তুই, পালা”। ব্যাস সে রাত্তিরে ঘর ছাড়লাম।
ঘর ছাড়ার পর কোথায় যাব এই চিন্তা একবারের জন্যও দুঃশ্চিন্তা হয়ে আসেনি। কেননা আমি জানতাম আমি বিমল কাকার কাছে গেলে সে বুক পেতে আমায় আগলে নেবে। বিমল কাকা আমাদের বাসুড়িয়াতে আগে ডাক্তারি করতেন, বয়স বাড়তেই তিনি তার হোমিও সেন্টার বন্ধ করে কুষ্টিয়ায় নিজ বাড়িতে চলে গেলেন।

ট্রেন ধরে, বাসে চেপে সারা রাত জার্নি করে উঠেছিলাম কুষ্টিয়ার বিমল কাকার বাড়ি। বিমল কাকার বাড়ি গিয়ে সেদিন দেখলাম দরজায় বিশাল তালা ঝোলানো, খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম বিমল কাকা কোলকাতা গেছেন স্ত্রীর চিকিৎসার খাতিরে। সারাদিন সেদিন নানা জায়গা ঘুরে, থাকার জায়গা না পেয়ে রাতে এক সস্তা হোটেলে উঠেছিলাম। বাড়ি ফেরা যাবে না এই পণ করে ঠিক করে নিয়েছিলাম বিমল কাকার জন্য অপেক্ষা করব, তিনি ফিরলেই উনার কাছে গিয়ে উঠব। হোটেলে কটা দিন কাটানোর পরেই হাতের টাকা পয়সা ফুরিয়ে এলো। কী করব কী করব এমন ভাবনায় যখন অস্থির ছিলাম তখন এক ফকির বাবার সাথে দেখা, উনি নিয়ে গেলেন লালন আখড়ায়। খাবার ঠিক জুটে গেল, থাকায় জায়গাও।

লালনের অজস্র ভক্ত, অনুরাগীর সাথে মিশে আমিও যে কখন লালনকে ভালোবেসে ফেললাম, মনে জায়গা দিয়ে দিলাম টেরও পেলাম না। লালনকে জানার আগ্রহ, বোঝার তীব্র আকাঙ্ক্ষার বীজ আমার মনে যে বুনে দিয়েছিল তার নাম ফ্লোরেল। প্রায় সাড়ে পাঁচফুট উচ্চতার, ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙের ইংরেজ মেয়ে ফ্লোরেল। ফ্লোরেল লালন আখড়ায় এসে উঠেছিল আমার তিন বছর আগে। স্পষ্ট, শুদ্ধ বাংলা বলতে জানে ফ্লোরেল। সাদা শাড়ি পরে, গায়ে কোনো গহনা নেই তার। দিন যেতেই কথায় কথায় জেনে নিয়েছিলাম ফ্লোরেল ইন্টারনেট ঘেঁটে লালনের খোঁজ পেয়েছিল। লালন দর্শনে প্রভাবিত হয়ে, গৎবাঁধা সংসারের প্রতি তীব্র অনীহা থেকেই তার এ দেশে ছুটে আসা। আমি যখন বলেছিলাম আমি বিয়ের আগের দিন পালিয়ে এসেছি তখন ফ্লোরেল হেসে কুটিকুটি। ঐ হাসি থেকেই আমাদের কথার পথ বাড়তে থাকল, সঙ্গে বন্ধুত্বটাও। লালন সাধক, ফকির বাবাদের সাথে ফ্লোরেল পাল্লা দিয়ে গাইত -“আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময় পারে লয়ে যাও আমায়…” আমি ফ্লোরেলের মুক্তোর মতো ঝকঝকে দাঁত, কপাল কুঁচকে গানে টান দেওয়ার দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। রাতের জলসা শেষে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত তখন আমি আর ফ্লোরেল জনমানবহীন মাটির রাস্তা ধরে ভোর হওয়া অবধি উদ্দেশ্যহীন হাঁটতাম। হাঁটতে হাঁটতে ফ্লোরেলকে আমি ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ, স্যামুয়েল টেইলর কিংবা চিত্রশিল্পী উইলিয়াম হোগার্থকে নিয়ে নানা কিছু জিজ্ঞাসা করতাম। আর ফ্লোরেল জানতে চাইত মুঘল সাম্রাজ্য, ফ্যাসিবাদ আর বাঙালিয়ানা নিয়ে আমার মতাদর্শ।

মুয়াজ্জিনের ঘুম ভাঙা গলায় ফজরের আযান শুনতেই আমরা আখড়ায় ফিরতাম, আখড়ায় ফিরেই দুজন পাশাপাশি শুয়ে কথার লাগাম টেনে কখন কে কার আগে ঘুমিয়ে পড়তাম সে হিসেব থাকত না। দুটো মানুষ দিনের পর দিন একে অপরের পাশাপাশি থাকলে, সারাক্ষণ একে অপরের সঙ্গ পেলে কেমন যেন একটা অধিকারবোধ চলে আসে। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সেটা হয়তো খুব দ্রুতই চলে আসে। সাথে খানিকটা টান, মায়া কিংবা অন্যকিছু। সেই মায়া, টান কিংবা অধিকারবোধ শক্ত করতেই যখন মাঝ রাত্তিরে দুজন উদ্দেশ্যহীন হাঁটতাম তখন ফ্লোরেল আমার হাতখানা আলগোছে ওর জিম্মায় নিয়ে যেত। আমি বাধা দেইনি, কেন দেইনি তা জানি না। ফ্লোরেল আমার হাত ধরলে পথটুকু সিরাজ সাঈজীর গানে বলা কল্পনার ফুলেল পথ হয়ে যেত, পথটুকুকে আপন মনে হত। উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটি কিংবা মধ্য রাতে পূব পাড়ার দিঘির ঘাটলায় বসে কথার পিঠে কথা সাজানো, দেবদারু গাছের তলায় বসে চোখের সামনে দিয়ে রাতটাকে ভোর করতে করতে ফ্লোরেল আমার কাঁধে ওর মাথা এলিয়ে দিয়ে কখনো গাইত,, ” বাড়ির পাশে আরশি নগর, সেথায় পড়শি বসত করে….” আবার কখনোবা গাইত, “জাত গেল, জাত গেল বলে…” ছোটোবেলায় কানের কাছে রেডিও নিয়ে চুপটি করে যেভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা ক্লান্ত হীনভাবে কাটিয়ে দিতাম তেমনি ফ্লোরেলকে রেডিও করে মুগ্ধ হয়ে কেবল চোখ বুজে ফ্লোরেলের জাদুকরা গানের গলা শুনে যেতাম। হুট করে কখন যে আমার হাত দুটো, চোখ দুটো লোভী হয়ে উঠল টেরই পেলাম না। ফ্লোরেলকে ছুঁয়ে দিতেই পারলে যেন শান্তি, এই কামনাটুকু দিনকে দিন আমাকে লোভী প্রেমিক করে তুলল, ক্ষুধার্ত পুরুষ করে তুলল। ফ্লোরেলের প্রতি থাকা মুগ্ধতা, টান কিংবা প্রচ্ছন্ন সম্মানের দায়ে হাত দুটোকে কোনোমতে নিবৃত্ত করে এক মধ্য রাতে ফ্লোরেলের হাত দুটো বুকের কাছে টেনে এনে বলেছিলাম, বিয়ে করবে আমায়? ফ্লোরেল আমার মুখের কাছে মুখ এনে নিচু গলায় বলেছিল, বিয়ে করলে কী? -ভালোবাসব তোমায়। ফ্লোরেল ওর হাত দুটো আমার কাছ থেকে চুপিসারে সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, ভালোবাসলে কী হয়? আমি ওমন কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি৷ ফ্লোরেল আমার নিরুত্তর থাকা দেখে ফিক করে হেসে উঠে বলেছিল, বিয়ে না করে বুঝি একসঙ্গে থাকা যায় না? আখড়ার পেছন দিকের অতিথি ঘরে আজ থেকে না হয় আমরা থাকলাম, থাকবে?

পুরুষ মানুষ তার চরিত্র নিয়ে চিরকাল উদাসীন ছিল, আমিও ওমন উদাসীনতা দেখাতে কার্পণ্য না করে ফ্লোরাকে সেই রাত থেকেই কাছে টেনে নিয়েছিলাম এক আসমান সমান অধিকারবোধ থেকেই। জলসা, আসরে দুজন একসঙ্গে লালন গেতে শুরু করলাম। অতিথি ঘরের পেছন দিকটায় ছন আর পাটকাঠিতে হেঁশেল গড়ে সেখানে দুজন মিলে রাঁধতে শুরু করলাম। ফ্লোরেল বাঙালি মেয়েদের মতো মাটির চুলোয় ফুঁ দিয়ে ভাত রাঁধত আর আমি পেঁয়াজ মরিচ কেটে পাশের চুলোয় তরকারি রাঁধতে বসে যেতাম। আমাদের মাঝ রাতের নিশাচর হওয়া স্বভাব তখনও রয়ে গিয়েছিল। ধুলোমাখা মাটির পথে দুজন খালি পায়ে হাঁটতাম আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে। পূর্ণ জ্যোৎস্নায় দিঘির ঘাটলায় বসে সুফিবাদ, লালন তত্ত্ব, হিটলার থেকে শুরু করে পারস্য রাজনীতি কোনকিছুই বাদ যেত না আমাদের আলোচনায়।

ঝুম বৃষ্টিতে দুজন দেবদারু গাছটার নিচে বসে কাক ভেজা হতাম। একটু উষ্ণতার জন্য ফ্লোরেল আমার কাছে ঘেঁষে আদুরে গলায় যখন জিজ্ঞেস করত আমি কাকে বেশি ভালোবাসি, তাকে নাকি লালনকে? আমি ফ্লোরেলের কোমরখানা ডান হাতে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে বলতাম, তোমাকে, তোমাকে এবং তোমকে। অন্ধকারে ফ্লোরেলের মুখখানা দেখা যেত না তবে ফ্লোরেল যে আমার ওমন উত্তরে সন্তুষ্ট ছিল না সেটা পরে বুঝেছি তখন না বুঝলেও। এক ভরা জ্যোৎস্নায় ফ্লোরেলে খুব ইচ্ছে হলো দিঘির নির্জলা জলে নেমে সাঁতার কাটার। দুজন একসাথে সাঁতার কাটছিলাম, ফ্লোরেল হুট করে থেমে গিয়ে মাঝ দিঘিতে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে আমাকে বলেছিল, সজল, তুমি লালনের চেয়ে আমায় বেশি ভালোবেসো না, আমি হারাতে চাই না তোমায়। সাঁতারের অনভ্যস্ততার কারণে আমি বেশ হাঁপিয়ে যাওয়ায় ফ্লোরেলের সেই কথা কানে তুলিনি। দিন আমদের বেশ যাচ্ছিল। পাখির মতো বাঁচতে শিখেছিলাম ইংরেজ পাখি ফ্লোরেলকে নিয়ে। পাখিদের একটা সময় পর নীড়ে ফিরতে হয়, খাঁচায় বন্দি হতে হয়৷ আমাকেও হয়েছে। কুষ্টিয়া পৌঁছে আমি এক দুঃসম্পর্কের ভাইকে টেলিফোন করে আমার ঠিকানা জানিয়ে দিয়েছিলাম। সেই ভাই মারফত এক দুপুরে খবর এলো আমার আব্বা মারা গেছেন, মা শয্যাশায়ী। খবর পাওয়া মাত্রই বাড়ি ছুটে গিয়েছিলাম। বাড়ি ফিরে শুনি আব্বা প্রচন্ড বুকে ব্যথা নিয়ে ছটফট করতে করতে মারা গেছেন, মা আব্বার শোকে বিছানায় পড়া সেদিন থেকেই। ভাইবোন না থাকায় মাকে দেখারও কেউ ছিল না। বাড়ি ফেরার পর সবাই কেমন ঘৃণার চোখে তাকাচ্ছিল আমার দিকে। পিতার মৃত্যুর দায় তখন আমার কাঁধে। নিজেকে খুব অপরাধী লাগছিল, খুব ঘৃণা হচ্ছিল নিজের প্রতি৷ দিন ঘুরতেই মায়ের অবস্থা বেকায়দা হতে শুরু করেছিল। মাকে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলাম চিকিৎসার খাতিরে । ওখানের ডাক্তাররা মাদ্রাজ নিয়ে মায়ের চিকিৎসা করাতে বলেছিল। মাদ্রাজ মাকে একা একা নিয়ে যাব, একা একা সামলাতে পারব কি না এমন দ্বিধায় মেঝো মামিকে ঢাকায় মায়ের কাছে রেখে কুষ্টিয়া ছুটে গিয়েছিলাম ফ্লোরেলের কাছে।চেয়েছিলাম ফ্লোরেলকে আমার সাথে মাদ্রাজ নিতে, তারপর আমার বাড়িতে ওঠাতে। মনে আছে এখনো, সেই রাতে ঝুম বৃষ্টি৷ বৃষ্টির রাতে আখড়ায় ফিরে দেখি ফ্লোরেল গানে মেতে আছে। আমাকে দেখেই সে মুখ টিপে হাসল। আসর শেষ হতেই আমরা অতিথি ঘরে গিয়ে উঠলাম শেষ বেলার মতো। ফ্লোরেলকে কাছে টেনে বলেছিলাম, আমার বাড়িতে থাকবে চলো, আর এখানে থাকতে হবে না। ওখানে গিয়ে সংসার পাতবো আমরা।
ফ্লোরেলের টাটকা হাসি তখন কেমন যেন পানসে হয়ে গিয়েছিল। ফ্লোরেল কৃত্রিম হাসি হেসে বলেছিল, না সজল! আমি সাঈজীরে ছেড়ে কোথাও যাব না, এই আখড়া ছেড়ে আমি কোথাও যাব না, সংসার এখানেই পাতবো আমরা। ফ্লোরেলকে সেদিন মায়ের কথা বলেছিলাম, আমার বাবার মৃত্যুর জন্য আমার অপরাধবোধের কথা বলেছিলাম। ফ্লোরেলের মন গলেনি। সে স্থির ছিল তার সিদ্ধান্তে। ফ্লোরেল নির্লিপ্ত ভাবে জবাবে বলেছিল, দেখো সজল, লালন আমরা ধর্ম, সাঈজীর চেয়ে বেশি ভালো আমি নিজেরেও বাসি না। ধর্ম ছাড়ি কেমনে কও তো? তোমাদের বানানো নিয়মে আমি থাকতে পারব না যে। তোমারে আমি এজন্যই বলেছিলাম লালনকে আমার চেয়ে বেশি ভালো বেসো তুমি, তুমি বাসলে না!

তোমাদের সংসারে গেলেই আমার জাত দেখবে, জাতের খোটা দেবে।আর আমার অচিন পাখি? সে তো উড়াল দেবে জাত টানলে, জাতের দাস হলে। তুমি ভালো যদি বাসো আমায় তবে জাত-পাত ছাড়া, লালনকে ভেতরে পুষে এই অতিথি ঘরে থেকো যাও না হয়। না, আমি থাকতে পারিনি। মাকে ফেলে, আব্বার ওমন মৃত্যুর দায় নিয়ে আমি আর লালন আখড়ায় পা দেইনি। মাকে নিয়ে চলে গিয়েছিলাম মাদ্রাজে। ফিরেছিলাম মাস চারেক পর। ঐ চার মাসে আমি বুঝেছিলাম মানুষ আসলে পাখি হবার পর আবার মানুষ হতে চায়। পাখিরা ঐ বিশাল আসমানে উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে মানুষ হতে চায়, আবার যখন তারা মানুষ হবে তখন আবার তারা পাখি হতে চাইবে, পাখির মতো বাঁচতে চাইবে। ঘর ছাড়া বাউন্ডুলে একদিন আবার ঘরে ফিরতে চায়, সংসার পাততে চায়। জীবন আসলে বুকে পোষা একটা নদীর মতো। যার এই কূলে থাকলে ঐ কূল টানে, আর ঐ কূলে থাকলে এই কূল টানে। আমি পাখির মতো বাঁচতে চেয়েছিলাম, সংসার থাকা মানুষের সংসারের টানে আর পাখি হওয়া হয় না৷ আমার বেলাতেও তাই হয়েছে। এখন আমি মানুষ হয়ে বেঁচে চলেছি, দুবছর হলো মায়ের পছন্দে বিয়ে করেছি। রোজ বাজারে যাই, বউকে কাছে টেনে ভালোবাসার কথা বলি, তাকে ছুঁয়ে দেই। ঝড় ওঠা রাত্তিরে কিংবা বিষণ্ণ বাউন্ডুলে সন্ধ্যায় আমার যখন মন খারাপ হয়, পাখি হয়ে উড়তে ইচ্ছে করে তখন আমি ফ্লোরেলকে মনে করি। দিঘিতে সাঁতার কাটি, দেবদারুর নিচে বসে গল্প করি আর অতিথি ঘরের পেছনের হেঁশেলে বসে আনাড়ি হাতে তরকারি রাঁধি। বুকের কোনো এক কোণে পাখির পালক লুকিয়ে রাখাটা দোষের নাকি দোষের না, এমন প্রশ্ন যখন মনে আসে তখন আমি আমার বউকে বিশ্ব রাজনীতি কিংবা পারস্য কবিদের কথা জিজ্ঞেস করার বদলে তাকে জিজ্ঞেস করি, ভালোবাসলে কী হয়? আমার বউ চুলে তেল দিতে দিতে ঈষৎ হেসে বলে, ভালোবাসলে অন্ধ হতে হয়, বোবা হতে হয়, বোকা হতে হয়, সব ছেড়ে ছুড়ে কেবল ভালোবেসে যেতে হয়। চতুরেরা ভালোবাসতে জানে না, কেবল পাখি হয়ে উড়তে চায় তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.