যা ঘটেছিল এমপি রাজী ও উপজেলা চেয়ারম্যান আজাদের মধ্যে, অবশেষে বেরিয়ে এলো আসল তথ্য

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার একটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ‍উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে হাতাহাতির অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় সংসদের

এলডি হলে অনুষ্ঠিত একটি সভায় উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে বিনা উস্কানিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুলকে অশ্রাব্য গালাগালের অভিযোগ ওঠে। যার জের ধরে উভয়ের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

পরে আবুল কালাম আজাদ রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো আহত তিনি হননি। শনিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে উপজেলা সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির বৈঠকে এ ঘটনা ঘটেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক সংসদ সদস্য এবিএম গোলাম মোস্তফার অনুরোধে সংসদ ভবনের এলডি হলে প্রস্তুতি কমিটির বৈঠক হয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে এবিএম গোলাম মোস্তফা উপস্থিত থাকতে না পারায় কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা জানান, বৈঠক শেষে এলাহাবাদ ইউনিয়ন ও আরেকটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণার কথা বলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এ সময় উত্তর জেলার সভাপতি রুহুল আমিন তার বিরোধিতা করেন। তিনিসহ জেলার সাধারণ সম্পাদক রওশন মাস্টার, সংসদ সদস্য রাজী ফখরুল ও উপজেলা চেয়ারম্যান আজাদ— এই চার জনে বসে কমিটি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু রওশন মাস্টার তা উপেক্ষা করে পছন্দের ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে কমিটি ঘোষণা করেন। তাৎক্ষণিক এর প্রতিবাদ করেন রাজী ফখরুল। বিপরীতে রওশন মাস্টারের কমিটির পক্ষে অবস্থান নেন উপজেলা চেয়ারম্যান আজাদ। এর জের ধরে তিনি বিনা উস্কানিতে এমপি রাজী ফখরুলকে গালাগাল করেন তিনি। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে হাতাহাতি হয়।

পরে সভাপতি রুহুল আমিন তাদের দুজনকে নিয়ে মিটমাট করতে চাইলে চেয়ারম্যান আজাদ তাতে সম্মতি না দিয়ে রাগ করে চলে যান। ওই সময় রওশন মাস্টারও চেয়ার ছুড়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন। এ ঘটনার পর আবুল কালাম আজাদ হাসপাতালে ভর্তি হন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একেএম মনিরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিটিং শেষে জেলা সাধারণ সম্পাদক রওশন আলী মাস্টার এলাহাবাদ ইউপির কমিটি ঘোষণা করার কথা বলেন। ওই ইউপির সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিমত থাকায় সভাপতি রুহুল আমিন নিজে, রওশন মাস্টার, এমপি রাজী ফখরুল ও উপজেলা চেয়ারম্যান আজাদ—

চার জনে বসে ঠিক করার কথা বলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে রওশন মাস্টার তা মানেন না উল্লেখ করে কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম উল্লেখ করেন। অথচ আমি উপজেলা সাধারণ সম্পাদক। আমার সভাপতিও আছেন। কিন্তু ন্যূনতম আলোচনা আমাদের সঙ্গে করেননি। এভাবে কমিটি ঘোষণা করায় এমপি রাজী ফখরুল আপত্তি তোলেন। এ নিয়ে তর্কবিতর্কে উপজেলা চেয়ারম্যান কালামও রওশন মাস্টারের পক্ষ নেন। এ সময় তিনি এমপিকে গালাগাল করেন। এর জের ধরে দুজনের হাতাহাতি হয়।

একেএম মনিরুজ্জামান আরও বলেন, হাতাহাতিতে চেয়ারম্যান আজাদ এমন অসুস্থ হননি যে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। তিনি সেখান থেকে হেঁটে বের হয়ে গেছেন। হাতাহাতি হলে শরীরের ওপরের দিকে আঘাত লাগবে। কিন্তু ফেসবুকে দেখছি কালাম সাহেবের পায়ে ব্যান্ডেজ। এলাকার মানুষ তো বলছেন উনি পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য আহত হওয়ার নাটক করছেন।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটিতে এমপির পছন্দের ব্যক্তিরা থাকায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তিনি আমাকে উপর্যপুরি ঘুষি মেরে আহত করেন। আমি তাকে মারধর করিনি। মার খাওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছি শুধু। ঘটনার পর সিড়ি দিয়ে হেঁটে বের হয়ে যাওয়া এবং হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো কেন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাকে তো জোরে ঘুষি মারা হয়েছে। মাথা ফুলে গেছে। হাসপাতালে সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। এখনও হাসপাতাল আমাকে রিলিজ দেয়নি।

উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা সফলভাবে সভা শেষ করি। সভা শেষে যখন যাওয়ার জন্য উঠবো তখন রওশন আলী মাস্টার ইউনিয়নের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণার জন্য বলেন। জবাবে আমি বলি এটা তো আমার বিষয় নয়। এটা এখানে ঘোষণার বিষয়ও নয়। এটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক দেবিদ্বারে ঘোষণা করবেন। পরে সবার অনুরোধে আমি একটি কমিটি করে দেওয়ার পক্ষে মত দেই। এ সময় রওশন আলী মাস্টার হুট করে এলাহাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একটি কমিটি ঘোষণা করলে পক্ষে-বিপক্ষে কথাবার্তা ‍শুরু হয়। এ সময় উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ এমপি মহোদয়কে বিনা উস্কানিতে গালাগাল করতে শুরু করেন। অশ্রাব্য ভাষায়ও গালি দিতে থাকেন। আমরা তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি। পরে এমপিও প্রতিবাদ করেন। এর জের ধরে দু’জনের মধ্যে হাতাহাতি হয়। পরে আমি উপজেলা চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করলাম আমার সঙ্গে যেতে। কিন্তু আজাদ আমাকে ধাক্কা দেয়, লাঞ্ছিত করে।

তিনি আরও জানান, ‘ঘটনাটি বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনকে জানানো হয়েছে। তার পরামর্শে দেবিদ্বারের সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটির সুরাহা হলে পরে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করবো।’ সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কারও মতামত না নিয়ে এককভাবে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণার প্রতিবাদ করি আমি। এজন্য উপজেলা চেয়ারম্যান আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে যা ঘটানোর তা ঘটিয়েছে। তাকে ইন্ধন দিয়েছেন রওশন আলী মাস্টার। উল্টো তারা এখন আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি এ ঘটনার নিন্দা জানাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.