হঠাৎ দলবল নিয়ে সেই কলেজে এমপি ফারুক

অধ্যক্ষকে পেটানোর ঘটনা নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই দলবল নিয়ে রোববার দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ী ডিগ্রি কলেজে হাজির হন রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী।

কলেজ অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকে তিনি আধাঘণ্টার মতো বসে ছিলেন। কলেজে ঢুকে এমপি ফারুক বলেন, আপনাদের দেখতে চলে এলাম।

এ সময় কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদুল হক ও স্থানীয় দেওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বেলাল উদ্দিন সোহেলসহ দলীয় নেতাকর্মীরাও কলেজ প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন।

তারা একপর্যায়ে অধ্যক্ষ সেলিম রেজার কক্ষে কিছু সময় বসেন ও কলেজের শিক্ষকসহ অন্যদের সঙ্গে কথা বলেন।

এ কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে এমপি ফারুক গত ৭ জুলাই রাতে তার মালিকানাধীন থিম ওমর প্লাজার নিজ রাজনৈতিক কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে বেদম মারপিট করেন।

এদিকে গত ৭ জুলাই রাতের ঘটনার পর প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিলেন অধ্যক্ষ সেলিম রেজা। তাকে মারধরের খবরে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠলে ১৪ জুলাই নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন এমপি ফারুক চৌধুরী।

সেখানে অধ্যক্ষ সেলিম রেজাও বিষন্ন বদনে তার পাশে উপবিষ্ট ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে এমপি ও অধ্যক্ষ উভয়েই দাবি করেছিলেন, ৭ জুলাই রাতে কোনো ঘটনা ঘটেনি।

সেলিম রেজা বলেছিলেন, এমপি তাকে মারধর করেননি। আর এমপি দাবি করেছিলেন, তিনি কাউকে মারধর করেননি। অধ্যক্ষকে মারধরের গুজব ছড়ানো তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ এ ষড়যন্ত্রের হোতা।

অন্যদিকে এমপি ফারুক চৌধুরীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ও প্রতিবাদে শনিবার পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের একটি অডিও রেকর্ড দেন। দাবি করা হয়, এটি অধ্যক্ষ সেলিম রেজা ও এক আওয়ামী লীগ নেতার কথোপকথন।

অডিওতে শোনা যায়, অধ্যক্ষ সেলিম রেজা এমপির হাতে পিটুনি খাওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন। অধ্যক্ষ অবশ্য রোববার কলেজের শিক্ষক অভিভাবক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের কাছে দাবি করেছেন তার ভয়েস ক্লোন করে অডিও বানানো হয়েছে।

তবে আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান বলেছেন, অডিওটি যে অধ্যক্ষ সেলিম রেজার সেটিও তিনি প্রমাণ করতে পারবেন। যে আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা ফোনে কথা বলেছেন, তার কল রেকর্ড ডেটা (সিডিআর) লিস্ট তুলে দেখা হলে অধ্যক্ষ যে এখনো মিথ্যা বলছেন তাও প্রমাণিত হবে।

অন্যদিকে এমপি ফারুক রোববার যখন রাজাবাড়ী কলেজে যান তখন তার মালিকানাধীন একটি অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টালের ফেসবুক পেজ থেকে অধ্যক্ষের বক্তব্য লাইভ প্রচার করা হয়। এমপি ফারুকের ডান পাশে বসে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা বলছিলেন, আসাদুজ্জামান আসাদ যে অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেছেন সেটি তার নয়। তার ভয়েস ক্লোন করে বানানো।

অধ্যক্ষের আরও দাবি, আসাদ তাকে দেখতে বাসায় গিয়েছিলেন ঠিকই, তবে তার সঙ্গে মারধর নিয়ে কোনো কথা হয়নি। অধ্যক্ষ বলেন, এমপি ফারুক চৌধুরীকে বেকায়দায় ফেলতে তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমপির সঙ্গে তার সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো।

অধ্যক্ষকে মারধরের ঘটনার রেশ না কাটতেই হঠাৎ কলেজে হাজির হওয়া নিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। এলাকার একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে বলেন, অধ্যক্ষকে পিটিয়ে দেশব্যাপী চলমান তীব্র সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ড্যামেজ কন্ট্রোল করতেই তিনি হঠাৎ কলেজে হাজির হয়েছেন। রাজশাহী ও তার নির্বাচনি এলাকাতেও তিনি মারাত্মক কোণঠাসা অবস্থায় আছেন। কয়েকজন চামচা নেতা ছাড়া কেউ তার সঙ্গ দিচ্ছে না।

কলেজে হঠাৎ হাজির হওয়া নিয়ে কথা বলতে এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীকে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। তবে সঙ্গে থাকা দলীয় এক নেতা দাবি করেছেন, অধ্যক্ষের কক্ষে আলোচনার সময় মারধর নিয়ে কোনো কথা হয়নি। তবে অন্যান্য নানা বিষয়ে অধ্যক্ষ, গভর্নিং বডি ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন এমপি।

এদিকে অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে মারধরের ঘটনাটি এখনো তদন্ত করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। গত ১৪ জুলাই থেকেই কমিটির সদস্যরা রাজশাহীতে আছেন। আসাদুজ্জামান আসাদের দেওয়া ভিডিওতে দুই ব্যক্তির কথোপকথনে আরও যেসব ব্যক্তির নাম এসেছে রোববার কমিটির সদস্যরা তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে কমিটি সূত্রে জানা গেছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে তদন্ত কমিটির প্রধান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেন বলেন, আমরা তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে ৫০ জনের বেশি মানুষের সঙ্গে আমরা এ বিষয়ে কথা বলেছি। তদন্তের প্রতিটি পর্যায়ে যার যার নাম পাওয়া যাচ্ছে তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই আমরা কথা বলছি। সর্বশেষ যে অডিওটি প্রকাশ হয়েছে এবং সেখানে যাদের নাম এসেছে তাদের সঙ্গেও কথা বলছি। আমরা পুরো বিষয়টা নিশ্চিত হচ্ছি। আমরা আমাদের প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ীই কাজ করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *