মুখ খুললে সব হারাতে হবে, অধ্যক্ষ পেটানো পুরোনো অভ্যাস এমপি ফারুকের

শিক্ষক পেটানো এমপি ফারুক চৌধুরীর পুরোনো অভ্যাস। রাজাবাড়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজার আগেও একই পদের দু’জনকে পিটিয়েছেন তিনি। তাঁদের একজনকে নিজ হাতে,

অন্যজনকে তাঁর মদতে অন্যরা মেরেছেন বলে জানা গেছে। ২০১৮ সালে এমপি ফারুকের মদতে পিটুনির শিকার হন গোদাগাড়ী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান। পিটুনির পর তাঁকে বরখাস্তও করা হয়।

মামলার আসামিও করা হয় তাঁকে। অনেকেই বলছেন, এ কারণে এবার এমপির হাতে মার খেয়েও অস্বীকার করছেন অধ্যক্ষ সেলিম রেজা। তিনি জানেন, মুখ খুললে হারাতে হবে চাকরিটাও। তাই নিজের চাকরি রক্ষায় মার খেয়েও মুখে কুলুপ এঁটেছেন তিনি।

গোদাগাড়ী সরকারি কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান সমকালকে বলেন, সে সময় এমপি ফারুক চৌধুরী কলেজটি সরকারীকরণের বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবি করেন। কথা ছিল, কলেজের ১০০ জন শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে সেই টাকা তুলে দেবেন। তিনি এমপির কথা মতো টাকাও তুলে দেন।

কিন্তু কিছু কম ছিল। তখন এমপির পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। ডাকা হয় সভা। সে সভায় এমপির উপস্থিতিতে তাঁর অনুসারী কয়েকজন শিক্ষক ও কয়েকজন বহিরাগত তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে সভায় তৎকালীন কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ইউএনও ছিলেন।

সবার সামনেই তাঁকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁর নামে টাকা আত্মসাতের মামলা করা হয়। আব্দুর রহমান জানান, কলেজ অধ্যক্ষ পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে উপাধ্যক্ষ ইমরুল হককে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।২০১৮ সালে সরকারি আব্দুল করিম সরকার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান মিয়াকে নিজেই চড় মেরেছিলেন এমপি ফারুক।

সে সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন। মামুন বলেন, একটি সার্কুলার নিয়ে তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে এমপি চড় মেরেছিলেন অধ্যক্ষকে। সে সময় অধ্যক্ষ তাঁর কাছে এসে কাঁদছিলেন। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছিল। এরপর ইউএনওর সামনেই তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছিলেন।

কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও তানোর আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাকিবুল সরকার পাপুল বলেন, ‘অধ্যক্ষ সম্পর্কে আমার মামা হন। নিয়োগের টাকা-পয়সা এমপিকে ঠিকমতো দিতে না পারায় তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে অধ্যক্ষকে চড় মারেন এমপি। পরে অধ্যক্ষ আমার কাছে এসে কান্না শুরু করেন।’

বর্তমানে অবসরে থাকা অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান মিয়াকে ফোন করলে সে ঘটনাটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমি অবসরে আছি। আমাকে আর কোনো ঝামেলায় জড়াবেন না।’ তিনি আরও দাবি করেন, সে সময় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যারা ছিলেন,

তাঁরা এমপির প্রতিপক্ষ। তাই তাঁরা এতদিন পর এসব বলছেন। রাজশাহীর শিক্ষক সমিতির নেতা অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশা বলেন, ‘অনেকের সঙ্গেই অসৌজন্যমূলক আচরণ ও মারধর করেছেন ফারুক চৌধুরী। অনেকেই ভয়ে জীবন ও চাকরি বাঁচাতে সেসব কথা বলতে চান না। আমরা তাঁর এসব অপকর্মের প্রতিবাদে মানববন্ধনও করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে এমপি ফারুক চৌধুরীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আব্দুর রহমান জামায়াতের নেতা ছিলেন। এই লোকটাকে যখন গণধোলাই দেওয়া হচ্ছিল, তখন আমি তাঁকে বাঁচাই। কয়েকজন তাঁর গলা চেপে ধরেছিল। যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত। অথচ ষড়যন্ত্রকারীরা আমাকেই পরে ফাঁসানোর চেষ্টা করে যে, আমি নাকি তাঁকে মারধর করেছি।’

এদিকে অধ্যক্ষ সেলিম রেজার বর্তমান অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্য ওমর ফারুকের পাশে বসে সংবাদ সম্মেলন করার সময় তাঁকে বেশ নির্জীব দেখা যায়। এ সময় তিনি বারবারই মারধরের কথা অস্বীকার করছিলেন। বলছিলেন, নিজেদের মধ্যে হাতাহাতি থেকে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে তাঁকে কে আঘাত করেছে, তা তিনি বলেননি। মার খাওয়ার কথা অস্বীকার করার সংবাদ গণমাধ্যমে এলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, ‘চাকরি ও জীবন বাঁচাতেই তিনি মার খেয়েও এখন তা অস্বীকার করছেন।’

এদিকে শিক্ষক পেটানোর ঘটনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠিত তিন সদস্যর তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবার থেকে রাজশাহীতে অবস্থান করে তদন্ত করছে। তদন্ত কমিটির সদস্য জয়ন্ত ভট্টাচার্য সমকালকে বলেন, ‘খুবই গুরুত্ব দিয়ে তদন্তকাজ চলছে। কোনো কিছুই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিবেদন আগে উপাচার্যকে প্রদান করা হবে। এর পর গণমাধ্যমে জানানো হবে।’

ইউট্যাবের প্রতিবাদ :অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে স্থানীয় সংসদ সদস্য মারধরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)। গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে ইউট্যাবের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম ও মহাসচিব অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান ওই ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

তাঁরা বলেন, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনায় দেশবাসী হতবাক এবং বাকরুদ্ধ। জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে স্বীকৃত শিক্ষক সমাজ আজ নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মারধরের ঘটনা তারই প্রমাণ। একজন আইনপ্রণেতার প্রকাশ্যে মারধর, লাঞ্ছিত ও নির্যাতনের ঘটনায় আমরা বিস্মিত। সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্যের এ ধরনের আচরণে প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশে আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত। এদিকে অধ্যক্ষকে লাঞ্ছনার নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে পৃথক বিবৃতি দিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.