প্রথা ভেঙে বিয়ে, যা বললেন নবদম্পতি (ভিডিওসহ)

কনের বাড়িতে বিয়ে হবে। বর পক্ষ সাজ সাজ রবে হাজির হবেন। ঠাট্টা মসকারা হবে। গেটে সেলামি দেওয়া নিয়ে দীর্ঘক্ষণ চলবে তর্কবিতর্ক।

খাওয়া দাওয়া নিয়ে বর পক্ষ অসন্তোষ হবেন। বেঁধে যাবে তুমুল গোলমাল। দেনমহরানা নিয়ে দরকষাকষি। শেষমেষ বিয়েই ভেঙ্গে গেল। অথবা বরকে রেখে বরযাত্রীরা ভুখা পেটে বাড়ি ফিরলেন।

চিরাচরিত সেই নিয়ম ভেঙে এবার কনেযাত্রী কনেসহ বরের বাড়িতে হাজির হলেন। ব্যতিক্রমী এ বিয়ের ঘটনা ঘটেছে বুধবার (১৩ জুলাই) দুপুরে ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। প্রথা ভেঙে বিয়ের পর এ নবদম্পতি কথা বলেন যুগান্তর প্রতিনিধির সঙ্গে।

এদিকে বৃহস্পতিবার (১৪ জুলাই) দিনভর চলেছে বধূবরণ। নব-দম্পতিকে দেখতে ছুটে আসছেন আশপাশের গ্রামের মানুষ। এ বিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে। বুধবার বিকালে কনে আসেন বরের বাড়ি। সঙ্গে সুসজ্জিত মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের বহর।

ফুল ছিটিয়ে আর মিষ্টি মুখ করিয়ে কনেকে বরণ করে নেন বরপক্ষের লোকজন। কনেকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বিয়ের আসরে। বরকেও বসানো হয় সেখানে। ধর্মীয় বিধান মতে কবুল পড়িয়ে বিয়ে হয় তাদের। বিয়ের পর বরের বাড়িতেই রয়ে যায় কনে।

কনে ইতি সেলিনা। ২০১৫ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। এর আগে ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাশ করেন। জেলা শহরের মুসা মিয়া বুদ্ধি বিকাশ বিদ্যালয়ে (নন এমপিও) নাচের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছেন।

বাবা শৈলকূপা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের জীপ চালক আব্দুল কাদের। দুই মেয়ে এক ছেলের জনক তিনি। ইতি সেলিনা বাবা মায়ের তৃতীয় সন্তান। বর এমএ মালিক। পেশায় ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ক্যামেরাপার্সন। তার পিতা শৈলকূপা উপজেলার মনহরপুর গ্রামের মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা শামছুদ্দিন লস্কর। বাবা মায়ের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। বুধবার (১৩ জুলাই) বিয়ে হয়েছে তাদের। সেই বিয়েতে ছিল অন্যরকম আয়োজন। চিরাচরিত প্রথা ভেঙ্গেছেন ইতি- মালিক।

কনের বাড়িতে বরযাত্রী নিয়ে বর যাননি। উল্টো বরের বাড়িতে হাজির হয়েছেন কনেসহ কন্যাযাত্রী। ধুমধামের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে তাদের। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার কোন ঘাটতি ছিলনা। ছিলনা কোন বাড়তি ঝামেলা। আগেই বর কনের জন্য সাজানো হয় বিয়ে পিঁড়ি। ফুলে ফুলে সাজানো একটি কার। বিয়ে সাজে কারের ভিতরে কনে ইতি সেলিনা। পাশে বসা একজন বয়স্ক নারী।

প্রথমে নামলেন তিনি। ছেলে বুড়োর দল ছুটে এলেন। কনেকে সরবত পান করানো হলো। ধীরে ধীরে নিয়ে যাওয়া হলো ছাদনাতলায় ( বিয়ের আসরে)। সেখানে আলাদা মঞ্চে আগে থেকেই বসে আছেন বর। দুইজনকে আলাদা আসনে বসানো হলো। কাজী সাহেব আগে থেকেই প্রস্তুত। ৫ লাখ টাকা দেন মোহরানায় বিয়ে হয়ে গেলো সেলিনা ও মালিকের।

কনেযাত্রীরা এসেছিলেন, সুসজ্জিত মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে। সংখ্যায় ছিলেন নারী পুরুষ শিশু মিলিয়ে কমপক্ষে ৫০ জন। বরপক্ষের আত্মীয় স্বজন গ্রামবাসীর কোলাহলে মুখরিত ছিল বিয়ে বাড়ি। খাওয়া দাওয়ার কমতি ছিলনা। পেট ভর্তি খাবার খেয়েছেন বর পক্ষ কনে পক্ষের লোকজন। বাদ পড়েননি গ্রামবাসীরাও। নবদম্পতির সঙ্গে বৃহস্পতিবার (১৪ জুলাই) দুপুরে প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা জানালেন ব্যতিক্রম বিয়ে আয়োজনের পিছনের গল্প।

ইতির ভাষায়- সুখকর এক স্বপ্নের নাম বিয়ে। একজন আরেক জনের কাছে আসা এবং আস্থার বাধন সৃষ্টি করে বিয়ে। শুধু তাই নয় সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি পরিবার গড়ে তোলার মাধ্যমও বিয়ে। কিন্তু চিরকাল বর পক্ষ কনের বাড়ি লোকজন নিয়ে যান। প্রচলিত সেই প্রথা ভাঙ্গতে নতুন ধরনের উদ্যোগ নেন তারা। এমন উদ্যোগের পিছনে সাহস দিয়েছেন ইতির শাশুড়ি মুক্তারি বেগম (মালিকের মা)।

ইতি আরও বলেন, শৈলকূপার জনপদে সামাজিক সংঘাত ও নারীর আত্মহত্যা বন্ধে তাদের এই বিয়ে উদাহরণ হয়ে হতে পারে। অপর দিকে বর মালিক বলেন, ইতির সঙ্গে আগে থেকেই সাংস্কৃতিক সূত্রে পরিচয় ছিল। ছোট বেলা থেকেই নতুন কিছু করার ইচ্ছে ছিল তার। শেষ পর্যন্ত ব্যতিক্রম বিয়ের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নারীর প্রতি সন্মান জানিয়ে এবং নারী নির্যাতন বন্ধে এধরণের উদ্যোগ অনুকরণীয় হতে পারে বলে মনে করি। এ বিয়ের আয়োজন ঘিরে এলাকার মানুষের উৎসাহ ও আনন্দের কমতি ছিল না। ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন শৈলকূপা উপজেলার নারী নির্বাহী অফিসার কানিজ ফাতিমা লিজা।

ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.