যে শর্তে মোটরসাইকেল চালানোর সুযোগ মিলল ঈদযাত্রায়

অন্য কোনো মাধ্যমে আসন্ন ঈদে বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে বা যৌক্তিক কারণে ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল চালকদের বাধা দেবে না পুলিশ।

এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মোটরসাইকেল চালককে তার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য একটি মুভমেন্ট পাস দেবে পুলিশ। এ পাস দেখিয়ে ওই মোটরসাইকেল চালক নির্বিঘ্নে ঈদযাত্রা করতে পারবেন।

যৌক্তিক কারণ দেখালে মোটরসাইকেল চালকদের বাধা না দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার (৭ জুলাই) দিবাগত রাতে এমন নির্দেশের কথা

নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) পদ মর্যাদার একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল চলাচলের নিষেধাজ্ঞার পর

আমাদের কাছে আরও একটি নির্দেশনা আসে। দ্বিতীয় নির্দেশনায় বলা হয়, যেসব মানুষ মোটরসাইকেল করে ঈদযাত্রা করবেন তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা

নমনীয় পদক্ষেপ নিতে। চালকরা যদি মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রার যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারেন তাহলে তাদের ছেড়ে দিতে। যৌক্তিক কারণে পুলিশ সন্তুষ্ট হলে চালকদের একটা মুভমেন্ট পাস দেওয়া হবে। এই পাস দেখানোর পর সেই চালক তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে নির্বিঘ্নে ঈদযাত্রা করতে পারবেন।

যৌক্তিক কারণগুলো কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখা গেছে ঐ ব্যক্তির কাছে মোটরসাইকেল ছাড়া ঈদযাত্রার আর কোনো উপায় নেই। সে কোনোভাবে ট্রেন বা বাসের টিকিট পাননি, ঢাকায় তার পরিবারও থাকে না। তাকে গ্রামের বাড়ি গিয়ে বা তার যেখানে বাড়ি সেখানে ঈদ পালন করবেন পরিবারের সঙ্গে। সেক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে। তবে ঢালাওভাবে ছাড় দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট অফিসার নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে চালকের কারণগুলো যৌক্তিক মনে করলে তিনি তাকে ছাড় দিতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মোটরসাইকেলের কাগজপত্র বৈধ হতে হবে ও ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে। এছাড়া মানসম্মত হেলমেট পড়ে যাত্রা করতে হবে।

এদিকে ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেলের চালকদের ছাড় দেওয়ার বিষয়ে বুধবার পুলিশের ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায়ও আলোচনা হয়। সভায় মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রার বিষয়ে সহনীয় পদক্ষেপের নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। সূত্র মতে জানা যায়, ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল চলাচলের বিআরটিএর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সন্তুষ্ট নয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের মতে, বিআরটিএর সিদ্ধান্তের ফলে মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া পুলিশের পক্ষে একা ঈদযাত্রার সময় একটি একটি মোটরসাইকেল থামিয়ে আটক করা সম্ভব নয় বা ফিরিয়ে দেওয়াও সম্ভব নয়। এতে করে রাস্তায় আরও যানজটের সৃষ্টি হতে পারে। ফলে মানুষের ভোগান্তি বাড়বে ঈদযাত্রায়।

ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৭ জুন) থেকে আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে অন্তত ৮টির বেশি চেকপোস্ট বসতে পারে। এসব চেকপোস্ট দিয়ে ঈদযাত্রার যাত্রীরাও নিজ নিজ গন্তব্যে যাবেন। প্রতিটি চেকপোস্টে মোটরসাইকেল আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে সমগ্র ঢাকায় ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হতে পারে। এমনিতেই বৃহস্পতিবার থেকে কোরবানির পশুর হাটের কেনাবেচা শুরু হলে রাজধানীর সড়কের যানজটের সৃষ্টি হবে।‌‌ এছাড়া মহাসড়কগুলোতে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষেও মোটরসাইকেল আটকে জিজ্ঞাসাবাদ ও কারণ জানতে চাওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। কেননা ঈদযাত্রা ও ফিরতি যাত্রায় মহাসড়কেও প্রচুর গাড়ির চাপ থাকে।

এ বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে বলেন, মোটরসাইকেলের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সরকারি নির্দেশ। আমাদের তা মানতেই হবে। তবে ঈদযাত্রার সময় এমনি প্রচুর গাড়ির চাপ থাকে রাজধানীর সড়কগুলোতে। জায়গা জায়গায় থাকে কোরবানির পশুর হাট। এ পরিস্থিতিতে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে আবার যদি মোটরসাইকেল চেক করে নিশ্চিত হতে হয় ঈদযাত্রা কিনা অথবা কেন কোথায় যাচ্ছে মোটরসাইকেল চালক তাহলে তো আরও বেশি যানজটের সৃষ্টি হতে পারে বিভিন্ন পয়েন্ট পয়েন্টে। তবে আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে পরিস্থিতি যতটুক নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এর আগে গত ৩ জুলাই সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে (ভার্চুয়ালি) মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আসন্ন ঈদুল আজহায় সাত দিন সারাদেশের মহাসড়কে যৌক্তিক কারণ ছাড়া মোটরসাইকেল না চালানোর পাশাপাশি এক জেলায় রেজিস্ট্রেশন করা মোটরসাইকেল অন্য জেলায় না চালানোর নির্দেশ দেয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে ও পরে সাত দিন এক জেলা থেকে অন্য জেলায় মোটরসাইকেল চালানো যাবে না। বন্ধ থাকবে মহাসড়কে রাইড শেয়ারিং। ৭ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এটি বলবৎ থাকবে। সরকারি এ নির্দেশনা পরিপালনে আগামী ৭ জুলাই থেকে রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশমুখে মোটরসাইকেল আটকানো হবে। তবে রাজধানীর আশপাশে ঢাকা জেলার অধীন কোনো গন্তব্যে চলাচলকারী যানবাহন এর আওতামুক্ত থাকবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বর্তমানে দেশে ৩৭ লাখের বেশি মোটরসাইকেল রাস্তায় চলছে। গণপরিবহন সংকট, বাস মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা, পদে পদে যাত্রী হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য, রেলের টিকিট অব্যবস্থাপনা, শিডিউল বিপর্যয়, যানজটসহ নানা কারণে ক্রমে মানুষ মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এ বাহনটি কখনোই গণপরিবহনের বিকল্প হতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, গত ঈদুল ফিতরে প্রায় ২৫ লাখ মোটরসাইকেল রাস্তায় নামার কারণে স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা হলেও সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। আপাতত গণপরিবহন সংকট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রা নিষিদ্ধ না করে বাহনটির স্পিড লিমিট করে দেওয়া, লাগেজ-ব্যাগেজ নিয়ে না যাওয়া, পরিবারের একাধিক সদস্য নিয়ে চলতে না দেওয়ার পাশাপাশি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে চলাচলের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে গণপরিবহনের অপ্রতুলতা-সঙ্কট সমাধান কিছুটা হলেও হবে। আর লাখ লাখ মানুষ বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার সুযোগ পাবে।‌‌ একই বিষয়ে বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, মোটরসাইকেল বন্ধ করে দেওয়া কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করে শৃঙ্খলায় আনা জরুরি। তাই বর্তমান সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে আলাদা লেন মেনে সুশৃংখলভাবে চালানোর নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। না মানলে জেল জরিমানার জরুরি বিধান করা, অবৈধ লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেল বন্ধে ঘন ঘন চেকপোস্ট বসানো, চলাচলের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদান করা যেতে পারে। তাই বলে পুরোপুরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। এতে করে লাখ লাখ মানুষ পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.