‘পুলিশ সেই গাড়িতেই মৃ’ত ছাত্রলীগ নেতার লা’শ নিয়ে যায় হাসপাতালে’

রাজনীতি: পুলিশের কাছে নিহত ফয়সালের আকুতি ছিল-‘স্যার, প্লিজ প্রয়োজনে আমার হাতে হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে এখান থেকে নিয়ে যান।

’আর আওয়ামী লীগের নেতাদের বলছিলেন-‘লিডার, আমাকে আপনাদের গাড়িতে করে কক্সবাজার পর্যন্ত নিয়ে যান, না হয় ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’

পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সামনে ধারাল দা, লোহার রড ও লাঠিধারী ৩০/৩৫ জন সন্ত্রাসী তখন হত্যার হুংকার ছাড়ছিল। তখনই কক্সবাজারের নিহত ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল বাঁচার জন্য

এমন করেই আকুতি জানিয়েছিলেন পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে। কিন্তু কেউই রক্ষা করতে পারেননি হতভাগা ছাত্রলীগ নেতাকে। হত্যাকাণ্ডের পূর্ব মুহূর্তে নিহত ছাত্রলীগ নেতা ফয়সালের এমন আকুতি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়েছে।

এদিকে ঘটনার পর পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বদানকারী বিএনপি কর্মী আজিজ সিকদারসহ পরিবারটির ৭ সদস্যকে আটক করেছে। তাদের মধ্যে দুজন নারীও রয়েছেন।

আজিজ সিকদারকে গতকাল সোমবার বিকালে র‌্যাব সদস্যরা আটক করেছেন। অপর ৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মুনীর উল গীয়াস জানান, গতকাল বিকালে নিহত ফয়সালকে দাফনের পর তার স্বজনরা থানায় হত্যাকাণ্ডের মামলা রুজু করতে গেছেন। কক্সবাজারের খুরুশকুলে রবিবার সন্ধ্যায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের চোখের সামনে আজিজ সিকদার নামের স্থানীয় একজন বিএনপি কর্মীর নেতৃত্বে তার পরিবারের ৩০/৩৫ জনের নারী-পুরুষ সশস্ত্র সদস্য ধারাল দা দিয়ে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে হত্যা করে। খুরুশকুল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক জসিম উদ্দিন জানান, স্থানীয় ডেইল পাড়া গ্রামের ‘ঘড়িবেচা পরিবার’ নামে পরিচিত বিরাট পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যরাই এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

তিনি জানান, পরিবারটির এক সদস্য বছর খানেক আগে হত্যার শিকার হয়েছিল। ওই হত্যাকাণ্ডে নিহত ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল জড়িত মর্মে পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করে আসছিলেন। সেই থেকে তাকে হত্যার জন্য মওকা খুঁজছিল হত্যাকারীরা। রবিবার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ছাত্রলীগ নেতা ফয়সালের উপস্থিতির খবর পেয়ে হত্যাকারীরা সম্মেলন স্থলে কয়েক দফা হানা দেয় ফয়সালকে তুলে নিতে। এরপরই পুলিশে খবর দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কক্সবাজার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল করিম মাদু কালের কণ্ঠকে জানান- ‘পুলিশের গাড়িতে ফয়সালকে নিলে সে বেঁচে যেত। শত অনুরোধ করা সত্ত্বেও পুলিশ তাদের গাড়িতে তাকে না তুলে একটি সিএনজি ট্যাক্সিতে তুলে দেয়। পরে পুলিশ সেই গাড়িতেই জীবিত ফয়সালের বদলে মৃত ফয়সালের লাশ নিয়ে যায় হাসপাতালে। ’ তিনি আফসোসের সুরে বলেন, ফয়সাল হত্যাকারীদের দেখে তার (মাহমুদুল করিম মাদু) গাড়িতেও উঠতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পুলিশের গাড়িকে অধিকতর নিরাপদ মনে করেছিলেন।

এদিকে হত্যাকাণ্ডটি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মনে ব্যাপকভাবে রেখাপাত করেছে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ছাত্রলীগও বঙ্গবন্ধু পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দফায় দফায় মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-ফেসবুকে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা তাদের সতীর্থ হত্যাকাণ্ডের জন্য হত্যাকারীদের চেয়ে বেশি দুষছেন আওয়ামী লীগ নেতা ও পুলিশকে। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের চোখের সামনে ছাত্রনেতা ফয়সাল নির্মমভাবে খুন হওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ ছাত্র নেতা-কর্মীসহ সমাজের নানা শ্রেণীর লোকজন ফেসবুকে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে আসছেন। তাদের অনেকেই বলছেন, মেজর সিনহা হত্যার ঘটনার পর কক্সবাজার জেলায় পদায়ন করা পুলিশ নিরবতা পালন করে চলেছেন। গত ৮ মাসেই একে একে শহরতলির লিংক রোডে শ্রমিক লীগ নেতা জহিরুল ইসলাম, পিএমখালীতে আওয়ামী লীগ কর্মী মোরশেদ বলি ও সর্বশেষ রবিবার খুরুশকুলে ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল উদ্দিনসহ তিন নেতা খুন হয়েছেন। এসব ঘটনার বিষয়ে পুলিশ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ বলে তাদের অভিযোগ। তবে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান এসব বিষয়ে বলেছেন, জেলা পুলিশের সদস্যরা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবেলায় তৎপর রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.