জাতীয় পার্টিকেও পাশে চায় বিএনপি

রাজনীতি: নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যে রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হচ্ছে, সেই পথে জাতীয় পার্টিকেও পাশে চায় বিএনপি।

জাতীয় পার্টির নেতাদের সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগ রয়েছে, বিএনপির এমন একাধিক নেতা বলেছেন, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে সব দলকে সাথে নিয়ে এগোতে চায় বিএনপি।

সেক্ষেত্রে মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি ‘ইভিএমে ভোট’ নাকচ করার পাশাপাশি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতেও একটা পর্যায়ে গিয়ে একমত হবে বলে তারা আশা করছেন।

জানা গেছে, জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপির রাজনীতিতে আসা কিংবা বিএনপি থেকে জাতীয় পার্টিতে যাওয়া এমন অনেক নেতাদের পরস্পরের সাথে রাজনৈতিক সংযোগ কিংবা হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। পারস্পরিক নানা আলোচনা থেকে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক অবস্থানও

বোঝার চেষ্টা করছেন বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ। যেখানে আশাবাদী হওয়ার মতো বিষয়ও রয়েছে বলে নেতাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন। জোটবদ্ধ রাজনীতিতে ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চার দলীয় জোট গঠনের শুরুতে ছিল এই জাতীয় পার্টি।

তবে পরে দলটির তৎকালীন সভাপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জোট থেকে বেরিয়ে গেলে তার দলের মহাসচিব নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে তখন জাতীয় পার্টির একটি অংশ বিএনপির জোটের সাথে যুক্ত থাকে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে মরহুম কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির আরেকটি অংশ বিএনপির জোটে আসে। যে দলটি এখনো ২০ দলীয় জোটে রয়েছে।

জাতীয় পার্টির বর্তমান নেতৃত্বে বিবাদ থাকলেও মূল অংশের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের। দলটি এখন সংসদে বিরোধী দলে রয়েছে। যদিও বিরোধী দল হিসেবে তাদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। দলটি বিরোধী দলের তকমা ধারণ করলেও বিস্ময়করভাবে তারা সরকারেরও অংশীদার। যে কারণে সরকারের সমালোচনা করার বদলে কখনো কখনো তোষামোদি হয়ে যায় দলটির রাজনীতির অংশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় পার্টির বর্তমান নেতৃত্বের একটি বড় অংশ বিতর্কিত এই ভূমিকা (একই সাথে সরকার ও বিরোধী দলে থাকা) থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। বিরোধী দল হিসেবে সংসদে কার্যকর ভূমিকাও রাখার পক্ষে তারা। সম্প্রতি দলটির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যেও সেটি ফুটে উঠেছে। কিছু দিন আগে দলের একটি অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘দেশে গণতন্ত্র নেই, একদলীয় স্বৈরশাসন চালু হয়েছে। সংবিধানকে কাটাকাটি করে স্বৈরতন্ত্রকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে গণতন্ত্রের স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। বহু দলীয় গণতন্ত্র রক্ষা করা যাবে।’

দলটির চিফ প্যাট্রন রওশন এরশাদ গত শনিবার বলেন, ‘পার্টিকে শক্তিশালী করা না গেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকা যাবে না। আমরা কি বিএনপির সমকক্ষ হতে পেরেছি, নিশ্চয় না। বিএনপি আছে, জামায়াত আছে, এটা মনে রাখতে হবে! দলকে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সমকক্ষ করতে না পারলে রাজনীতিতে টিকে থাকা যাবে না।’ রওশন এরশাদের এমন বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন জি এম কাদেরও। জানা গেছে, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় পার্টির ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করছে বিএনপি। ইভিএমে ভোট নিয়ে দলটির ভূমিকা বিএনপি ইতিবাচক হিসেবেই দেখেছে।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে কমিশনের সাথে আলোচনা এবং ইভিএম ব্যবহার দেখে জাতীয় পার্টি মহাসচিব মো: মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘আমরা ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট নেয়ার পক্ষে নই। কারণ দেশের মানুষ এখনো ইভিএমে ভোট দেয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ এখনো ইভিএম বিশ্বাস করে না। গ্রামগঞ্জের মানুষ এখনো মনে করেন ইভিএম মানেই কারসাজি। কেউ কেউ মনে করেন, কোনো একটি দলের স্বার্থে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হয়।’

বিএনপি আশা করছে, ইভিএমে ভোট নিয়ে জাতীয় পার্টি যেভাবে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে, সুষ্ঠু নির্বাচন কিভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে তা নিয়ে তারা সোচ্চার হবে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব সে ইস্যুতেও তারা মুখ খুলবেন। গত প্রায় ২০ বছর ধরে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সাথে মহাজোট গঠনের পর নির্বাচনে অন্যতম নিয়ামক হয়ে ওঠে জাতীয় পার্টি। গত কয়েকটি নির্বাচনে মহাজোটের শরিক দল হিসেবে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সাথে দরকষাকষিও করেছে অনেক।

বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের সাথে জাতীয় পার্টির ভোট একত্র হওয়ার কারণে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় মহাজোট প্রার্থীদের বিজয় শুধু নিশ্চিতই হয়নি অনেক সহজও হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এরশাদের জাতীয় পার্টি এখনো নির্বাচনে অন্যতম ব্যালেন্সিং ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে মূলত নিরপেক্ষ নির্বাচনের এক দফা দাবিতে বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে একটি যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছে বিএনপি। ইতোমধ্যে ডান-বাম বহুদলের সাথে দলটি বৈঠক করেছে। নেতারা বলছেন, শিগগিরই এই আন্দোলন গড়ে উঠবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *