মৃ’ত্যুর ২৪১৫ বছর পরে আদালতের রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত

স’ক্রেটিস। একজন বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক। বিশ্বে যত বড় বড় দা’র্শনিকের জ’ন্ম হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম স’ক্রেটিস। এই গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসকে চেনেন না এমন মানুষ পাওয়া দু’ষ্কর।

ইউরোপের দেশ গ্রিসে তার জন্ম। উইকিপিডিয়ায় স’ক্রেটিস স’ম্পর্কে জেনেছি বহু আগেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও স’ক্রেটিসকে বন্দি করে রাখা সেই জেলখানার ছবি দেখেছি অনেক।

তখন থেকেই মনে আগ্রহ জাগে কোনোদিন গ্রিসে গেলে বিখ্যাত দার্শনিক স’ক্রেটিসের শেষ ঠিকানায় যাব। সেই আগ্রহ থেকেই একদিন গিয়েছিলাম স’ক্রেটিসের জেলখানায়।

সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প’র্যটকদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। পাহাড়ের ওপর থেকে যেন পুরো এথেন্স ক্যামেরাবন্দি করা যায়। সবমিলিয়ে খুবই চমৎকার ও মনোমু’গ্ধকর পরিবেশ।

ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করে স’ক্রেটিসের শৈশব স’ম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। তবে উনার শিষ্য প্লে’টোর লেখনিতেই সক্রেটিস স’ম্পর্কে জানা যায়। পা’শ্চাত্য সভ্যতার ইতিহাসে মহান দার্শনিক

সক্রেটিসের (জন্ম খ্রি.পূ. ৪৬৯-মৃত্যু খ্রি.পূ. ৩৯৯, জন্মস্থান: এথেন্স, গ্রিস) নাম উজ্জ্বল ও ভাস্বর হয়ে আছে। প্লে’টোর বর্ণনামতে সক্রেটিসের বাবার নাম সফ্রোনিস্কাস, যিনি পেশায় একজন স্থপতি (অন্য মতে ভাস্কর) এবং মায়ের নাম

ফিনারিটি, যিনি একজন ধাত্রী ছিলেন। তার স্ত্রীর নাম জ্যানথিপ। সংসার জীবনে তাদের তিন ছেলেসন্তানের জন্ম হয়। অভাবের সংসার বলে সংসার জীবনে খুব একটা সুখী ছিলেন না।

সংসারের জ্বা’ল-য’ন্ত্রণা ভুলতে তিনি বেশিরভাগ সময় দার্শনিক তত্ত্ব আলোচনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। তার নাক নাকি ছিল থ্যা’বড়া। দেখতেও ছিলেন অনেকটা কু’ৎসিত।

তবে ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। তর্কে ছিলেন তুখোড়। তর্ক করে কেউ তাকে হারাতে পারতো না। তার প্রিয় বাক্য ছিল ‘নিজেকে জানো’।

সক্রেটিস তার নিজ দর্শন প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার প্রভৃতি যখন যেখানে সুবিধা সেখানেই আবাল-বৃ’দ্ধ-বণিতার সঙ্গে বিনামূল্যে তিনি দর্শন আলোচনায় প্রবৃত্ত হতেন।

সোফিস্টদের মতো তিনি শিক্ষাদানের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণকে ঘৃ’ণা করতেন। দার্শনিক আলোচনার প্রতি তার এত বেশি ঝোঁক ছিল যে, তিনি প্রায়শই বলতেন- “নিজেকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেয়াই আমার অভ্যাস, আর এজন্যই এমনিতে না পেলে পয়সা-কড়ি দিয়ে হলেও আমি দার্শনিক আলোচনার সাথী সংগ্রহ করতাম।”তিনি নিজেকে কখনও সোফিস্টদের মত জ্ঞানী ভাবতেন না। তিনি বরং বলতেন- “আমি জ্ঞানী নই, জ্ঞা’নানুরাগী মাত্র। একটি জিনিসই আমি জানি; আর সেটি হলো এই যে, আমি কিছুই জানি না।”

জ্ঞান, শিক্ষা দিয়ে তিনি এথেন্সের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। তার অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তার প্রিয় শিষ্য প্লে’টো প্রচার করতে থাকেন গু’রুর শিক্ষা-দীক্ষা। কিন্তু দেশটির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সক্রেটিসের এ খ্যাতি মেনে নেয়নি। পছন্দ করেনি তার শিক্ষা-দর্শন।

একপর্যায়ে তারা অ’ভিযোগ করেন, স’ক্রেটিস নাকি যুব সমাজকে বিপথগামী করছেন। এ অভিযোগে তাকে ঢোকানো হলো কারাগারে। কিন্তু এতেও তাকে থামানো যায়নি। তাই সি’দ্ধান্ত হয় মৃ’ত্যুদণ্ড দেওয়ার।সত্য ও জ্ঞানের প্রতি অবিচল সক্রেটিসকে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী তথাকথিত অভিযোগে তাকে হেমলক বিষপানে মৃ’ত্যুদণ্ড দেয় এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সক্রেটিস নিজ হাতে বিষাক্ত হেমলকের রস পান করে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়েন। তার নশ্বর দেহটা এথেন্সে মাটিতে মিশে গেলেও তার আদর্শ ও চিন্তা যুগ যুগ মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার প্রেরণা জুগিয়েছে। মৃ’ত্যুর আগে তাকে পালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি পালাননি।

এদিকে মৃ’ত্যুদ’ণ্ড কার্যকরের ২৪১৫ বছর পরে গ্রিসের একটি আদালত জানালেন, সক্রেটিস নি’র্দোষ ছিলেন।এথেন্সের তৎকালীন আরাধ্য দেবতাদের নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন সক্রেটিস। তার বি’রুদ্ধে অ’ত্যাচারী শাসকদের সমর্থনেরও অভিযোগ আনা হয়েছিল। যদিও বলা হয় যে, সক্রেটিস নির্দোষ হলেও মুখ বুজে বিচারকদের রায় মেনে নিয়েছিলেন। মৃ’ত্যুর আগে পালানোর সুযোগ পেলেও এথেন্স ছেড়ে যাননি তিনি।

হেমলক বিষপান করে মৃ’ত্যুদণ্ডের আদেশ মাথা পেতে নিয়েছিলেন সক্রেটিস। তিনি সত্যিই দোষী ছিলেন কিনা, সেই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য এথেন্সের ওনাসিস ফাউন্ডেশনের একটি আদালতে ফের নতুন করে বিচারব্যবস্থার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই বিচারেই সক্রেটিসকে স’ম্পূর্ণ নি’র্দোষ বলে রায় দিয়েছে ওই আদালত।সক্রেটিসের সমর্থনে তার আইনজীবী বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির অভিমত অপরাধ হতে পারে না। সক্রেটিস সত্যের স’ন্ধান করতেন। আর তা করতে গিয়েই তিনি তার নিজস্ব মত তুলে ধরতেন। তবে আমার ম’ক্কেলের একটাই দো’ষ, তিনি উ’স্কানিমূলক কথা বলে মানুষকে খ্যাপাতেন।

আর সবসময় বাঁকা বাঁকা কথা বলতেন। যেমন- তিনি বলতেন, দেখাও তোমাদের গণতন্ত্র কতটুকু খাঁটি ও বিশ্বাসযোগ্য ইত্যাদি।’ কিন্তু তিনি আরও বলেন যে, সাধারণ মামলাকে জটিল করার জন্য মৃ’ত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি দেওয়াটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।স’ক্রেটিসের হয়ে এই মা’মলায় ফ্রান্সের এই বিখ্যাত আইনজীবী সওয়াল করেন। উল্টোদিকে গ্রিসসহ বেশ কয়েকটি দেশের আইনজীবীরা স’ক্রেটিসের বিরোধিতা করেন। এই মা’মলার বিচারের জন্য আমেরিকা ও ইউরোপীয় বিচারকদের সমন্বয়ে একটি প্যানেল তৈরি করা হয়। দীর্ঘ বাদানুবাদের পরে স’ক্রেটিসের আইনজীবীর যুক্তিতেই সিলমোহর দেন বিচারকরা। ২০১৬ সালে নিউইয়র্কের একটি আদালতেও সক্রেটিস নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন।